ওইসিডির পর্যবেক্ষণ

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে থমকে গেছে বিশ্ব অর্থনীতির গতি বাড়ছে মূল্যস্ফীতি

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের জেরে বিশ্ব অর্থনীতি এক অনিশ্চিত পথে ধাবিত হচ্ছে।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্যারিসভিত্তিক এ সংস্থা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খবর আরব নিউজ।

লক্ষ্যমাত্রা থেকে বিচ্যুত বিশ্ব অর্থনীতি

ওইসিডির মতে, ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার আগে বিশ্ব অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়েও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পথে ছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এ সম্ভাবনা কার্যত মিলিয়ে গেছে। নতুন প্রাক্কলন অনুযায়ী, গত বছরের ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে কমে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ২ দশমিক ৯ শতাংশে। ২০২৭ সালে এটি সামান্য বেড়ে ৩ শতাংশ হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ ও ২০২৫ সালের ইতিবাচক গতির সুবিধা থাকলেও জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম এবং যুদ্ধের অনিশ্চয়তা প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

সংস্থাটির প্রধান মাথিয়াস করম্যান সাংবাদিকদের বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতদিন স্থায়ী হবে বা এর ব্যাপ্তি কতটা হবে, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে প্রবৃদ্ধি আরো কমতে পারে ও মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে।’

মূল্যস্ফীতির নতুন রেকর্ড ও নেতিবাচক পূর্বাভাস

যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় জি২০ জোটের সদস্য দেশগুলোর গড় মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে প্রত্যাশার চেয়ে ১ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ৪ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। ওইসিডির পূর্বাভাস অনুযায়ী, জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় ধরে চড়া থাকলে দ্বিতীয় বছর নাগাদ বিশ্ব প্রবৃদ্ধি আরো দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমতে পারে ও মূল্যস্ফীতি আরো দশমিক ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়তে পারে।

সংস্থাটি জানায়, সংঘাত না ছড়ালে ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধি বর্তমানের চেয়ে দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। যুদ্ধের প্রভাবে সে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি এখন পুরোপুরি মুছে গেছে।

প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর হালচাল

যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতিগুলোয় ভিন্নভাবে পড়ছে। যেমন চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশে নামতে পারে, যা ২০২৭ সালে আরো কমে ১ দশমিক ৭ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে শক্তিশালী বিনিয়োগ থাকলেও মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়া এবং ভোক্তাদের ব্যয় হ্রাসের ফলে এ ধীরগতি দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

এদিকে চীনের প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং আগামী বছর ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে, যা ওইসিডির আগের পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুতে চীনের কারখানা উৎপাদন এবং খুচরা বিক্রি উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মাঝে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির জন্য এটি একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে শিল্পোৎপাদন ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে।

এছাড়া জ্বালানির চড়া দামের কারণে ২০২৬ সালে ইউরো অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি কমে দশমিক ৮ শতাংশে নামতে পারে। তবে ২০২৭ সালে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ার ফলে এটি ১ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে আশা করছে ওইসিডি।

সংস্থাটি আরো জানায়, জাপানের প্রবৃদ্ধি ২০২৬ ও ২০২৭ উভয় বছরেই দশমিক ৯ শতাংশে স্থির থাকতে পারে। ব্যবসায়িক বিনিয়োগ বাড়লেও জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয় একে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রাখবে। অন্যদিকে চলতি বছরের জন্য সৌদি আরবের ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অপরিবর্তিত থাকলেও ২০২৭ সালের লক্ষ্যমাত্রা ৩ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর প্রতি আহ্বান

বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় ওইসিডি বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে যেন সাধারণ মানুষের জন্য নেয়া সহায়তা কর্মসূচিগুলো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ও স্বল্পমেয়াদি হয়। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে তেল, গ্যাস ও সারের দাম ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে, এমন শর্তের ওপর ভিত্তি করে বর্তমান প্রাক্কলন করা হয়েছে। তাই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ২০২১ সাল থেকে কোভিড-১৯ মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে যে মূল্যস্ফীতি দুই অংকের ঘরে পৌঁছেছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। কারণ বিশ্বের প্রধান উন্নত দেশগুলোর শ্রমবাজার এখন আগের চেয়ে অনেকটা দুর্বল ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রানীতিও বেশ কঠোর।

আরও